পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হদীছের আলোকে রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য ১৩টি
আপনি কি এমন একটি মহৎ ইবাদত সম্পর্কে জানতে চান যার মাধ্যমে আপনার জীবনের বিভিন্ন
ধরনের অন্যায়, অশ্লীল, পাপাচার ও গুনাহ গুলো ক্ষমা করিয়ে নিয়ে আপনি কি পরকালে
মুক্তি পেতে চান? তাহলে আপনার আর চিন্তার কোন কারণ নেই। কারণ আজকে আমাদের এই
আর্টিকেলটির মূল আলোচনায় হচ্ছে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হদীছের আলোকে রোজার গুরুত্ব ও
তাৎপর্য ১৩টি সেই সম্পর্কে। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যবহুল ও প্রয়োজনীয় আলোচনা
করা হবে। তাহলে চলুন দেরি না করে জেনে নেওয়া যাক!
আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ আর্টিকেলটির মাধ্যমে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হদীছের আলোকে
রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য ১৩টি এ বিষয় সম্পর্কে এমন কিছু ইউনিক ও কার্যকরী তথ্য
সম্পর্কে জানাবো, যেগুলিকে জেনে আপনি খুব সহজেই আপনার জীবনের যাবতীয় গুনাহ ক্ষমা
করে নিতে পারবেন। সাথে সাথে পরকালীন জীবনের চিরস্থায়ী সুখ ও মুক্তির জন্য উত্তম
পাথেয় সঞ্চয় করতে পারবেন। আপনি কি আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য গুলো
জানতে চান, তাহলে আজকের এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র আপনার জন্যই। পবিত্র কুরআন ও
ছহীহ হদীছের আলোকে রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য ১৩টি এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ মনোযোগ
সহকারে পড়ুন। তাহলে আশা করি আলোচ্য বিষয়ে বিস্তারিতভাবে নির্ভুল সব তথ্য গুলো
জানতে পারবেন। ইনশাআল্লাহ!
পেজ সূচিপত্রঃ
.
ভূমিকা
সুন্দর এই পৃথিবীতে বসবাসরত প্রতিটি মানুষের জীবনে জানা-অজানা বিভিন্ন ধরনের
গুনাহ রয়েছে, তবে যারা এই গুনাহগুলোকে বিভিন্ন ভালো আমল করার মাধ্যমে ক্ষমা
করিয়ে নিতে পারে এবং ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারে তারাই হচ্ছে সর্বোত্তম। প্রিয়
পাঠক আজকে আপনাদেরকে এই আর্টিকেলটির মাধ্যমে এমন একটি মহৎ ইবাদত সম্পর্কে জানাবো
যার মাধ্যমে আপনি আপনার জীবনের সমস্ত গুনা খাতা মাফ করে নিতে পারবেন। কিন্তু
অনেকেই এ বিষয়ে সঠিক তথ্যগুলো জানার পরেও তেমন গুরুত্ব দেয় না।
এই জন্য তারা ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর বুকে ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও আত্মমর্যাদার
অধিকারী হয়ে এই জীবনকে সুন্দরভাবে কাটাতে পারেন না। তাই আপনি যদি পবিত্র কুরআন ও
ছহীহ হদীছের আলোকে রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য ১৩টি এই বিষয়গুলো সম্পর্কে পুরোপুরি
স্পষ্ট ধারণা রাখেন তবে আপনি সম্মানের সাথে একটি উৎফুল্ল ও সুখী জীবন যাপন করতে
পারবেন এবং পরকালের চিরস্থায়ী জীবনের অনাবিল সুখের জন্য উত্তম পাথেয় সঞ্চয়
করতে পারবেন।
তাই আজকের এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ মনোযোগ সহকারে পড়ুন, তাহলে পবিত্র কুরআন ও
ছহীহ হদীছের আলোকে রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য ১৩টি সম্পর্কে পুরোপুরি ভালোভাবে
জানতে পারবেন। এছাড়াও রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য, রোজা সম্পর্কে কুরআনের আয়াত,
রোজার ফজিলত সম্পর্কে হাদিস এই বিষয়গুলো সম্পর্কেও বিস্তারিত জানতে পারবেন। তাই
আপনি যদি পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হদীছের আলোকে রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য ১৩টি এ বিষয়
সম্পর্কে জানতে চান, তাহলে আজকের এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য খুবই কার্যকরী।
রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ হলো কালেমা বা ঈমান, ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ ও যাকাত। ইসলামের
পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে ছিয়াম পালন করা হচ্ছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। الصوم
হচ্ছে আরবি শব্দ। ছওম এর অর্থ হচ্ছে আত্মসংযম বা বিরত থাকা। ছিয়াম হচ্ছে ছওমের
বহুবচন। ফারসি ভাষায় ছওমকে রোজা বলা হয়।
“শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই মূলত
ছুবহে ছাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যাবতীয় পানাহার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তি ছিয়াম
ভঙ্গকারী সকল কাজ যেমন স্ত্রী সহবাস বা যৌন সম্ভোগ থেকে বিরত থাকাকে ছওম বা
ছিয়াম বলা হয়।” দ্বিতীয় হিজরী সনে ছিয়াম ফরজ করা হয়। ইসলামের প্রধান পাঁচটি
রুকনের মধ্যে ছওম হচ্ছে অন্যতম।
সাধারণত এই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত গুলোর মধ্যে কালেমা বা ঈমান ও ছালাতের পরেই
হচ্ছে ছওমের স্থান। রামাযান মাসে আকাশে চাঁদ উদিত হলে প্রত্যেক সুস্থ ব্যক্তি,
মুকীম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং প্রাপ্তবয়স্ক হায়েজ নেফাসমুক্ত নারীদের উপর পুরো
রমাযান মাসে ছিয়াম পালন করা মহান আল্লাহ তা'আলা ফরজ করেছেন। নিম্নে রোজার
গুরুত্ব ও তাৎপর্য - রোজার ফজিলত ও মাসায়েল সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো।
রোজা সম্পর্কে কুরআনের আয়াত
ছওমের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ
করেছেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ
عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
অনুবাদঃ “মহান আল্লাহ বলেন, হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের উপর ছিয়াম ফরজ করা হলো, যেমন
তা ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা মুত্তাকী বা
আল্লাহভীরু হতে পারো” (বাক্বারাহ ২ নং সূরা/১৮৩ নং আয়াত)
أَيَّامًا مَعْدُودَاتٍ فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ
فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ
مِسْكِينٍ فَمَنْ تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَهُ وَأَنْ تَصُومُوا خَيْرٌ
لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ
অনুবাদঃ “গনিত কয়েকটা দিন মাত্র। অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পীড়িত হয় অথবা
সফরে থাকে, সে যেন এটি অন্য সময় পালন করে। আর যাদের জন্য এটি খুব কষ্টকর হয়,
তারা যেন প্রতিদিনের পরিবর্তে একজন করে মিসকীনকে খাদ্য দান করে। যদি কেউ
স্বেচ্ছায় বেশি দেয়, সেটা তার জন্য কল্যাণকর হবে। আর যদি তোমরা ছিয়াম রাখো,
তবে সেটাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা বুঝো।” (বাক্বারাহ ২ নং সূরা/১৮৪ নং
আয়াত)
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآَنُ هُدًى لِلنَّاسِ
وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ
فَلْيَصُمْهُ وَمَنْ كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ
أُخَرَ يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ
وَلِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ
وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
অনুবাদঃ “রমযান হলো সেই মাস, যাতে কুরআন নাযিল হয়েছে। যা মানুষের জন্য পথ
প্রদর্শক ও সুপথের স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী। অতএব
তোমাদের মধ্যে যে ব্যাক্তি এ মাস পাবে, সে যেন এ মাসের ছিয়াম রাখে। তবে যে
ব্যক্তি পীড়িত হবে অথবা সফরে থাকবে, সে এটি অন্য সময় গণনা করবে। আল্লাহ তোমাদের
জন্য সহজ চান, কঠিন চান না। যাতে তোমরা (এক মাসের) নির্ধারিত গননা পূর্ণ করতে
পারো। আর যাতে তোমরা তোমাদের সুপথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করতে
পারো এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে পারো।” (বাক্বারাহ ২ নং সূরা/১৮৫ নং আয়াত)
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ
إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ
অনুবাদঃ “আর যখন আমার বান্দারা তোমাকে আমার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে, তখন (তাদেরকে
বলো যে,) আমি নিকটেই আছি। আমি আহ্বানকারীর আহ্বানে সাড়া দেই যখন সে আমাকে আহ্বান
করে। অতএব তারা যেন আমাকে ডাকে এবং আমার উপরে বিশ্বাস রাখে, যাতে তারা সুপথ
প্রাপ্ত হয়।” (বাক্বারাহ ২ নং সূরা/১৮৬ নং আয়াত)
اُحِلَّ لَكُمۡ لَیۡلَۃَ الصِّیَامِ الرَّفَثُ اِلٰی نِسَآئِكُمۡ ؕ هُنَّ
لِبَاسٌ لَّكُمۡ وَ اَنۡتُمۡ لِبَاسٌ لَّهُنَّ ؕ عَلِمَ اللّٰهُ اَنَّكُمۡ
كُنۡتُمۡ تَخۡتَانُوۡنَ اَنۡفُسَكُمۡ فَتَابَ عَلَیۡكُمۡ وَ عَفَا عَنۡكُمۡ ۚ
فَالۡـٰٔنَ بَاشِرُوۡهُنَّ وَ ابۡتَغُوۡا مَا كَتَبَ اللّٰهُ لَكُمۡ ۪ وَ كُلُوۡا
وَ اشۡرَبُوۡا حَتّٰی یَتَبَیَّنَ لَكُمُ الۡخَیۡطُ الۡاَبۡیَضُ مِنَ الۡخَیۡطِ
الۡاَسۡوَدِ مِنَ الۡفَجۡرِ۪ ثُمَّ اَتِمُّوا الصِّیَامَ اِلَی الَّیۡلِ ۚ وَ لَا
تُبَاشِرُوۡهُنَّ وَ اَنۡتُمۡ عٰكِفُوۡنَ ۙ فِی الۡمَسٰجِدِ ؕ تِلۡكَ حُدُوۡدُ
اللّٰهِ فَلَا تَقۡرَبُوۡهَا ؕ كَذٰلِكَ یُبَیِّنُ اللّٰهُ اٰیٰتِهٖ لِلنَّاسِ
لَعَلَّهُمۡ یَتَّقُوۡنَ
অনুবাদঃ “ছিয়ামের রাতে তোমাদের জন্য স্ত্রীগমন সিদ্ধ করা হলো। তারা তোমাদের
পোষাক এবং তোমরা তাদের পোষাক। আল্লাহ জেনেছেন যে, তোমরা খেয়ানত করেছ। তিনি
তোমাদের ক্ষমা করেছেন এবং তোমাদের মার্জনা করেছেন। অতএব এখন তোমরা স্ত্রীগমন করো
এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছেন তা সন্ধান করো। আর তোমরা খানাপিনা
করো যতক্ষণ না রাত্রের কালো রেখা থেকে ফজরের শুভ্র রেখা তোমাদের নিকট স্পষ্ট হয়।
অতঃপর ছিয়াম পূর্ণ করো রাত্রির আগমন পর্যন্ত। আর তোমরা স্ত্রীগমন করো না যখন
তোমরা মসজিদে ই’তিকফ রত থাকো। এটাই আল্লাহর সীমারেখা। অতএব তোমরা এর নিকটবর্তী
হয়ো না। এভাবে আল্লাহ স্বীয় আয়াত সমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেন মানুষের কল্যাণের
জন্য, যাতে তারা সংযত হয়।” (বাক্বারাহ ২ নং সূরা/১৮৭ নং আয়াত)
রোজার ফজিলত সম্পর্কে হাদিস
আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম ছওম
عن أبى أمامة قال : قلت يا رسول الله! مرني بعمل قال : عليك بالصوم فإنه لا عدل
له قلت : يا رسول الله! مرني بعمل قال : عليك بالصوم، فإنه لا عدل له
হযরত আবু উমামা (রাঃ) বলেন, আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ! আমাকে কোনো আমলের
আদেশ করুন। তিনি বললেন তুমি ছিয়াম রাখো, কেননা এর সমতুল্য আর কিছু নেই। আমি
পুনরায় বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ! আমাকে কোনো নেক আমলের কথা বলুন, তিনি
বললেন, তুমি ছিয়াম পালন করো কেননা এর সমতুল্য কোন কিছু নেই। (মুসনাদে আহমদ
হা/২২১৪০; ছহীহ ইবনে খুযাইমা হা/১৮৯৩; সুনানে নাসায়ী কুবরা হা/২৫৩৩; ছহীহ ইবনে
হিববান হা/৩৪২৫)
عن أبى أمامة الباهلى قال : قلت يا رسول الله مرني بأمر ينفعني الله به، قال :
عليك بالصوم فإنه لا مثل له
হযরত আবু উমামা আল-বাহিলী (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি বললাম হে আল্লাহর
রাসূল (ছাঃ) ! আমাকে এমন কোন আমলের আদেশ করুন, যার দ্বারা আল্লাহ তা'য়ালা আমাকে
উপকৃত করবেন। তিনি বললেন তুমি ছিয়াম রাখো কেননা তার তুলনা হয় না। (মুসনাদে আহমদ
হা/২২১৪১; সুনানে নাসায়ী হা/২৫৩১; বাইহাকী, শুয়াবুল ঈমান হা/৩৮৯৩; তাবারানী
হা/৭৪৬৩)
মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সব থেকে শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো ছিয়াম পালন করা। সুতরাং
যাবতীয় ইবাদতের প্রশিক্ষণের মাস রমযান মাসের ফরজ ছিয়াম সহ আরো অন্যান্য নফল
ছিয়াম গুলো পালন করে মহান আল্লাহর নৈকট্যশীল বান্দা হওয়ার জন্য সর্বদা সচেষ্ট
থাকতে হবে। অতএব এই বরকতপূর্ণ মাসে ছিয়াম পালনের মাধ্যমে পরকালীন পাথেয় হিসাবে
আল্লাহর পথে যতটা সময় ব্যয় করা যায় ততটাই আমাদের জন্য কল্যাণকর ও পরকালীন
মুক্তির পথ হিসেবে বিবেচিত হবে।
ছিয়াম পালনকারী ব্যক্তির দোয়া কবুল করা হয়
ছিয়াম পালনকারী ব্যক্তির দোআ কবুল করা সম্পর্কে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ)
থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন- إن للصائم عند فطره لدعوة ما
ترد
“ইফতারের মুহূর্তে ছিয়াম পালনকারী ব্যক্তি যখন দোআ করে, তখন তার দোআ ফিরিয়ে
দেওয়া হয় না (অর্থাৎ তার দোআ কবুল করা হয়)।” (সুনানে ইবনে মাজাহ হা/১৭৫৩)
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন-
ثلاثة لا ترد دعوتهم الإمام العادل، والصائم حتى يفطر، ودعوة المظلوم، تحمل على
الغمام، وتفتح لها أبواب السماوات، ويقول الرب عز وجل : وعزتى لأنصرنك ولو بعد
حين
“তিন ব্যক্তির দোআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না (অর্থাৎ তাদের দোয়া কবুল করা হয়)।
ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোআ, ছিয়াম পালনকারী ব্যক্তির দোআ ইফতারের সময় পর্যন্ত এবং
মজলুমের দোআ। তাদের দোআ সমূহ মেঘমালার উপরে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং আসমানের দরজার
সমূহ খুলে দেয়া হয়। তখন আল্লাহ তা'য়ালা বলেন আমার সম্মান ও প্রতিপত্তির কসম!
দেরিতে হলেও অবশ্যই আমি তোমাকে সাহায্য করবো।” (ছহীহ ইবনে হিববান হা/৩৪২৮, সুনানে
ইবনে মাজাহ হা/১৭৫২, সুনানে তিরমিযী হা/ ৩৫৯৮, মুসনাদে আহমাদ হা/৮০৪৩)
অন্য একটি বর্ণনায় হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন নবী কারীম
(ছাঃ) বলেছেন- الصائم لا ترد دعوته
“ছিয়াম পালনকারী ব্যক্তির দোআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।” (মুসান্নাফে ইবনে আবী
শাইবা হা/ ৮৯৯৫)
অতএব প্রিয় পাঠক আসুন পবিত্র এই মাসে ছিয়াম পালনরত অবস্থায় এই সুবর্ণ সুযোগকে
কাজে লাগিয়ে আমাদের নেক চাওয়া পাওয়া গুলো আল্লাহর কাছে পেশ করি, যেন আমাদের
মনোবাসনা গুলো পূর্ণ হয়।
ছিয়াম পালনকারী ব্যক্তির যাবতীয় গুনাহ মাফ করে নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ
পবিত্র রমযান মাসে ছিয়াম পালনকারীর ব্যক্তির সব ধরনের গুনাহ মাফ করে নেওয়ার
একটি সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। এ সম্পর্কে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি
বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন- من صام رمضان إيمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من
ذنبه
“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ছওয়াবের আশায় রমযানের ছিয়াম পালন করে তার বিগত সকল
গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।” (বুখারী হা/৩৮, মুসলিম হা/৭৬০, মিশকাত হা/১৯৫৮,
মুসনাদে আহমদ হা/৭১৭০, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা হা/৮৯৬৮)
অপর এক বর্ণনায় হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন- إن الله عز وجل فرض صيام رمضان وسننت قيامه، فمن صامه
وقامه ايمانا واحتسابا خرج من الذنوب كيوم ولدته أمه
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর রমযানের ছিয়াম ফরজ করেছেন, আর আমি
ক্বিয়ামুল লাইল অর্থাৎ তারাবীর ছালাতকে সুন্নত করেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি ঈমানের
সাথে ছওয়াবের আশায় রমযানের ছিয়াম ও ক্বিয়াম আদায় করবে সে ওই দিনের মতো
নিষ্পাপ হয়ে যাবে যেদিন সে মায়ের গর্ভ থেকে সদ্য ভুমিষ্ট হয়েছিল।” (সুনানে
নাসায়ী হা/২৫১৮, মুসনাদে আহমাদ হা/১৬৬০, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা হা/৭৭৮৭,
ছহীহ ইবনে খুযাইমা হা/২২০১)
প্রিয় পাঠক অতএব আসুন আমরা আমাদের জীবনের যাবতীয় গুনাহ খাতা গুলো রমযান মাসের
এই সুবর্ণ সুযোগে ক্ষমা করিয়ে নিই।
আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং নিজেই ছিয়ামের প্রতিদান হিসেবে অগণিত ছাওয়াব দিবেন
প্রতিটি নেক আমল করার বিনিময়ে আমলকারীর জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে
নির্ধারিত কিছু প্রতিদান বা ছাওয়াব বরাদ্দ থাকে, যা প্রদানের মাধ্যমে নেক
আমলকারীকে পুরস্কৃত করা হয়। কিন্তু ছিয়ামের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রিয়
পাঠক তাহলে চলুন জেনে নেওয়া যাক ছিয়ামের প্রতিদান হিসেবে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ
হাদীছে মহান আল্লাহ তায়ালা এবং তার রাসুল কি বলেছেন?
প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন-
كل عمل ابن آدم يضاعف الحسنة بعشر أمثالها إلى سبعمائة ضعف، قال الله تعالى : إلا
الصوم فإنه لى وأنا أجزى به يدع شهوته وطعامه من أجلى
“বনু আদম তথা মানুষের প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়। একটি নেকীর
ছাওয়াব ১০ গুন থেকে ২৭ গুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা
বলেন, ছিয়ামের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। কেননা তা শুধুমাত্র আমার জন্যই করা হয়
এবং আমি স্বয়ং নিজেই এর প্রতিদান দিব। কারণ বান্দা একমাত্র আমার জন্যই নিজের
প্রবৃত্তিকে দমন করেছে এবং দিনের বেলায় যাবতীয় পানাহার ও যৌন সম্ভোগ পরিত্যাগ
করেছে।” (মুসলিম হা/১১৫১, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা হা/৮৯৮৭, ইবনে মাজাহ
হা/১৬৩৮, মুসনাদে আহমাদ হা/৯৭১৪)
আরো পড়ুনঃ দ্রুত মাথা ব্যথা কমানোর ঘরোয়া উপায়
অন্য একটি বর্ণনায় হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন- يترك
طعامه وشرابه وشهوته من أجلى، الصيام لي وأنا أجزي به، والحسنة بعشر أمثالها
“মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, বান্দা শুধুমাত্র আমার জন্যই তার পানাহার ও যৌন
সম্ভোগ থেকে বিরত থাকে। সুতরাং ছিয়াম আমার জন্যই অতএব আমি স্বয়ং নিজে তার
প্রতিদান দিব এবং অন্যান্য নেক আমলের বিনিময় হচ্ছে তার দশগুণ।” (বুখারী হা/১৮৯৪,
মুয়াত্তা মালেক ১/৩১০, মুসনাদে আহমাদ হা/৯৯৯৯)
পবিত্র রমযান মাসের ছিয়ামের এত বড় ফজিলত ও তাৎপর্যের অন্যতম কারণ হতে পারে
সীমাহীন ধৈর্য ধারণের ফলস্বরূপ হিসেবে। এজন্যই আল্লাহ তা'আলা ধৈর্যধারণকারীদের
জন্য সুসংবাদ হিসাবে পবিত্র কুরআনুল কারীমে বর্ণনা করেছেন- إِنَّمَا يُوَفَّى
الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
“কেবলমাত্র ধৈর্যধারণকারীরাই অগণিত ছাওয়াবের অধিকারী হবে।” (যুমার সূরা নং ৩৯/
আয়াত নং ১০)
অতএব প্রিয় পাঠক এই বিশ্ব চরাচরের প্রতিপালক মহান আল্লাহ তাআলা যখন নিজেই
ছিয়ামের পুরস্কার দিবেন, তখন কি পরিমান ছাওয়াব দিবেন তা নির্ধারণ করা আমাদের
কল্পনারও বাইরের বিষয়। এ বিস্ময় দূর করতে গিয়ে প্রখ্যাত ইমাম আওযায়ী
রাহিমাহুল্লাহ উক্ত হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “মহান আল্লাহ তায়ালা ছিয়াম
পালনকারী ব্যক্তিকে প্রতিদান বা পুরস্কার হিসেবে যা দিবেন তা মাপাও হবে না ওজনও
করা হবে না অর্থাৎ বিনা হিসাবেই অগণিত প্রতিদান দিবেন।”
ছিয়াম হলো জান্নাত লাভের অন্যতম উপায়
প্রিয় পাঠক ছিয়াম পালন করা যে জান্নাত লাভের অন্যতম উপায় এ বিষয়ে ছহীহ হাদীছে
কি বলা হয়েছে চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক।
عن حذيفة رضي الله عنه قال : أسندت النبي صلى الله عليه وسلم إلى صدري، فقال : من
قال : لا إله إلا الله ختم له بها دخل الجنة، ومن صام يوما ابتغاء وجه الله ختم
له به، دخل الجنة، ومن تصدق بصدقة ختم له بها، دخل الجنة
“প্রখ্যাত সাহাবী হযরত হুযায়ফা (রাঃ) বলেন, আমি নবী কারীম (ছাঃ) কে আমার বুকের
সাথে জড়িয়ে ধরলাম তারপর তিনি বললেন, যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে মৃত্যু
বরণ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের
লক্ষ্যে একদিন ছিয়াম পালন করবে তারপর মৃত্যু হলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যে
ব্যক্তি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোন দান-ছাদকা করবে তারপর মৃত্যুবরণ করবে
সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (মুসনাদে আহমাদ হা/২৩৩২৪)
অন্য আরেকটি হাদীছে রয়েছে-
عن أبي أمامة قال : أتيت رسول الله صلى الله عليه وسلم، فقلت : مرني بعمل يدخلني
الجنة، قال : عليك بالصوم، فإنه لا عدل له، ثم أتيته الثانية، فقال لي : عليك
بالصيام
“হযরত আবু উমামা আল বাহিলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)
এর কাছে আগমন করে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন যার
মাধ্যমে আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারব। তখন তিনি বললেন, তুমি ছিয়াম রাখো, কেননা
এর সমতুল্য কিছুই নেই। আমি পুনরায় তার নিকট একই কথা বললাম, তিনি বললেন, তুমি
ছয়াম পালন করো।” (নাসাঈ হা/ ২৫৩০, ইবনে হিব্বান হা/৩৪২৬, ইবনে খুজাইমা হা/১৮৯৩,
মুসনাদে আহমাদ হা/২২১৪৯)
অতএব প্রিয় পাঠক আপনি আমি যদি মহান আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই
ছিয়াম পালন করি তাহলে মহান আল্লাহ তা’য়ালা প্রতিদান হিসেবে আমাদেরকে জান্নাতুল
ফিরদাউস দান করবেন ইনশাআল্লাহ!
ছিয়াম পালনকারী ব্যক্তিগণই জান্নাতের “রাইয়ান” নামক দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে
যারা মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই শুধুমাত্র ছিয়াম পালন
করবে, মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাদেরকে জান্নাতুল ফেরদাউসে “রাইয়ান” নামক বিশেষ একটি
দরজা দিয়ে প্রবেশ করাবেন। চলুন জেনে নেওয়া যাক হাদীছে এই সম্পর্কে কি বলা
হয়েছে?
প্রখ্যাত সাহাবী হযরত সাহল ইবনে সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী কারীম
(ছাঃ) বলেছেন-
إن فى الجنة بابا يقال له الريَّان يدخل منه الصائمون يوم القيامة، لا يدخل منه
أحد غيرهم، يقال : أين الصائمون فيقومون، لا يدخل منه أحد غيرهم، فإذا دخلوا
أغلق، فلم يدخل منه أحد
“জান্নাতের একটি বিশেষ দরজা আছে, যার নাম রাইয়ান। কিয়ামতের দিন এই দরজা দিয়ে
শুধুমাত্র ছিয়াম পালনকারী ব্যাক্তিরাই প্রবেশ করবে। অন্য কেউই এই দরজা দিয়ে
প্রবেশ করতে পারবে না। যখন ঘোষণা করা হবে কোথায় সেই সৌভাগ্যবান ছিয়াম
পালনকারিগর? তখন তারা উঠে দাঁড়াবে। তারা ব্যতীত কেউ এই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে
পারবে না। অতঃপর ছিয়াম পালনকারীদের যখন প্রবেশ করা শেষ হবে, তখন তা বন্ধ করে
দেওয়া হবে। ফলে ওই দরজা দিয়ে আর কেউ প্রবেশ করতে পারবে না।” (বুখারী হা/১৮৯৬,
মুসলিম হা/১৮১৫২, মুসনাদে আহমাদ হা/২২৮১৮)
অপর এক হাদীছে প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)
বলেছেন-
لكل أهل عمل باب من أبواب الجنة يدعون منه بذلك العمل، ولأهل الصيام باب يدعون
منه، يقال له : الريان، فقال أبو بكر : يا رسول الله، هل أحد يدعى من تلك الأبواب
كلها؟ قال : نعم، وأرجو أن تكون منهم يا أبا بكر
“প্রতিটি নেক আমলকারীর জন্য জান্নাতে একটি করে বিশেষ দরজা থাকবে, যার যেই নেক
আমলের প্রতি বেশি অভ্যস্ত ছিল তাকে সে দরজা দিয়ে আহ্বান করা হবে। অনুরূপভাবে
ছিয়াম পালনকারীদের জন্যও একটি বিশেষ দরজা থাকবে, যা দিয়ে তাদেরকে ডাকা হবে। সেই
দরজার নাম হবে “রাইয়ান”। আবু বকর (রাঃ) বললেন হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) এমন কেউ কি
আছেন যাকে সকল দরজা থেকে আহবান করা হবে? উত্তরে রাসূল (ছাঃ) বললেন হ্যাঁ, আমি আশা
করি তুমিও তাদের একজন হবে।” (মুসনাদে আহমাদ হা/৯৮০০, মুসান্নাফে আবী শাইবা
হা/৩২৬২৮)
প্রিয় পাঠক অতএব আসুন আমি আপনি প্রত্যেকেই যেন প্রতিটি নেক আমলের প্রতি যত্নবান
হই বিশেষ করে ছিয়ামের প্রতি। যাতে করে এই উচ্চ মর্যাদাটি লাভ করতে পারি।
ছিয়াম হলো জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ঢাল স্বরূপ
পাঠক আপনি যদি কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই ছিয়াম পালন করেন,
তবে এই ছিয়ামটিই হবে আপনার জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য বিশেষ ঢাল। যা আপনাকে
জাহান্নামে দগ্ধীভূত হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখবে। এ সম্পর্কে হযরত জাবের (রাঃ)
থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন- قال ربنا عز وجل : الصيام جنة
يستجن بها العبد من النار وهو لي وأنا أجزي به
“আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন, ছিয়াম হলো ঢালস্বরূপ। বান্দা এর
দ্বারা নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করতে পারবে। ছিয়াম আমার জন্য আর আমি
স্বয়ং এর পুরস্কার দিব।” (শুয়াবুল ঈমান বাইহাকী হা/৩৫৭০, মুসনাদে আহমেদ
হা/১৪৬৬৯)
অপর এক বর্ণনায় উসমান ইবনে আবিল আস (রাঃ) বর্ণনা করেন আমি রাসূল (ছাঃ) কে বলতে
শুনেছি- الصيام جنة من النار كجنة أحدكم من القتال
“ছিয়াম হলো জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ঢালস্বরূপ। যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে (তোমাদের
শত্রুর আঘাত হতে রক্ষাকারী) ঢালের মত।” (ইবনে মাজাহ হা/১৬৩৯, ইবনে হিব্বান
হা/৩৬৪৯, মুসনাদে আহমাদ হা/১৬২৭৮)
অপর একটি বর্ণনায় হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন- الصيام
جنة، وحصن حصين من النار
“ছিয়াম হলো (জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ লাভের) ঢালস্বরূপ এবং সুরক্ষিত দুর্গের
মত।” (বাইহাকী শুয়াবুল ঈমান হা/৩৫৭১, মুসনাদে আহমাদ হা/৯২২৫)
ছিয়াম পালনকারী ব্যক্তিদের জন্য দুইটি আনন্দের মুহূর্ত রয়েছে
ছিয়াম পালনকারী ব্যক্তিদের দুটি আনন্দের মুহূর্ত সম্পর্কে হযরত আবু হুরায়রা
(রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন- للصائم فرحتان يفرحهما
إذا أفطر فرح، وإذا لقي ربه فرح بصومه، وفي رواية : اذا لقى الله فجزاه فرح
“ছিয়াম পালনকারী ব্যক্তিদের জন্য দুটি আনন্দের মুহূর্ত রয়েছে। ১.যখন সে ইফতার
করে তখন তার ইফতারের কারণে আনন্দ পায়। ২.যখন সে তার প্রতিপালকের সাথে কিয়ামতের
দিনে মিলিত হবে তখন তার ছিয়ামের কারণে সে আনন্দিত হবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে,
যখন সে তার প্রতিপালকের সাথে মিলিত হবে, তখন তিনি তাকে উত্তম পুরস্কার দিবেন। তখন
সে আনন্দ দিতে হবে।” (বুখারি হা/১৯০৪ ও ১৮৯৪, মুসলিম হা/১১৫১,১৬৩,১৬৪ ও ১৬৫,
তিরমিযী হা/৭৭৬, মুসনাদে আহমাদ হা/৯৪২৯ ও ৭১৭৪)
ছিয়াম পালনকারী ব্যক্তির মুখের গন্ধ মিশকে আমবারের চেয়েও সুগন্ধি যুক্ত
এ বিষয়ে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন-
والذى نفس محمد بيده لخلوف فم الصائم أطيب عند الله من ريح المسك
“সেই সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মাদের জীবন রয়েছে, ছিয়াম পালনকারী ব্যক্তির
মুখের দুর্গন্ধ মহান আল্লাহর নিকটে মিশকের সুগন্ধির চেয়েও অধিক সুগন্ধিময়।”
(বুখারী হা/১৯০৪, মুসলিম হা/১১৫১,১৬৩, মুসনাদে আহমদ হা/৭১৭৪, ইবনে মাজাহ হা/১৬৩৮,
নাসাঈ হা/২৫২৩)
جاء رجل إلى النبي صلى الله عليه وسلم فقال : يا رسول الله! أرأيت إن شهدت أن لا إله إلا الله وأنك رسول الله، وصليت الصلوات الخمس وأديت الزكاة وصمت رمضان وقمته فممن أنا؟ قال : من الصديقين والشهداء
ছিয়াম পালনকারী ব্যক্তি পরকালে সত্যবাদী ও শহীদগণের দলে অন্তর্ভুক্ত হবেন
এ সম্পর্কে হযরত আমর ইবনে মুররা আল জুহানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন-جاء رجل إلى النبي صلى الله عليه وسلم فقال : يا رسول الله! أرأيت إن شهدت أن لا إله إلا الله وأنك رسول الله، وصليت الصلوات الخمس وأديت الزكاة وصمت رمضان وقمته فممن أنا؟ قال : من الصديقين والشهداء
“একদা এক ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ) এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) আমি যদি এ
কথার সাক্ষ্য দিই যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং অবশ্যই আপনি আল্লাহর রাসূল,
আর আমি যদি পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করি, যাকাত প্রদান করি ও রমযান মাসের ছিয়াম
ও ক্বিয়াম (অর্থাৎ তারাবীহ সহ অন্যান্য নফল) ছালাত আদায় করি, তাহলে আমি কাদের
দলভুক্ত হব? তিনি বললেন, সিদ্দিকীন তথা সত্যবাদী ও শহীদগণের দলভুক্ত হবে।” (ইবনে
হিব্বান হা/৩৪২৯, ইবনে খুযাইমা হা/২২১২, মুসনাদে বাযযার হা/২৫)
ছিয়াম যাবতীয় হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেয়
ছিয়াম পালনকারী ব্যক্তির হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেয়। এ বিষয়ে হযরত ইবনে আব্বাস
(রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন-صوم شهر الصبر وثلاثة أيام من
كل شهر يذهبن وحر الصدر
“ধৈর্যের মাসের (রমযান মাস) ছিয়াম এবং প্রতি মাসের তিন দিনের (আইয়্যামে বিয)
ছিয়াম অন্তরের হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেয়।” (ইবনে হিব্বান হা/৬৫২৩, মুসনাদে
আহমাদ হা/২৩০৭০)
ছিয়াম কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবে
ছিয়াম কিয়ামতের দিন ছিয়াম পালনকারী ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করবে। এ সম্পর্কে
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন-
الصيام والقرآن يشفعان للعبد يوم القيامة، يقول الصيام : اى رب منعته الطعام والشهوة فشفعني فيه، ويقول القرآن : منعته النوم بالليل، فشفعني فيه، قال : فيشفعان له
الصيام والقرآن يشفعان للعبد يوم القيامة، يقول الصيام : اى رب منعته الطعام والشهوة فشفعني فيه، ويقول القرآن : منعته النوم بالليل، فشفعني فيه، قال : فيشفعان له
ছিয়াম ও কুরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। ছিয়াম বলবে, হে আমার
প্রতিপালক! আমি তাকে খাদ্য ও যৌন সম্ভোগ থেকে বিরত রেখেছি। অতএব তার ব্যাপারে
আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কুরআন বলবে আমি তাকে রাতের ঘুম থেকে বিরত রেখেছি
(অর্থাৎ না ঘুমিয়ে এসে কুরআন তেলাওয়াত করেছে)। অতএব তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ
কবুল করুন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, অতঃপর তাদের উভয়ের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।
অতএব প্রিয় পাঠক পবিত্র কুরআন ও ছিয়ামের সুপারিশ পেতে হলে আমাদের কেবলমাত্র
আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই ছিয়াম পালন করতে হবে এবং বেশি বেশি কুরআন
তেলাওয়াত করতে হবে।
ছিয়াম পালনকারী ব্যক্তিকে আল্লাহ তা’য়ালা কিয়ামতের দিন হাউজে কাউসারের পানি পান করাবেন
হযরত আবু মুসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- ان الله تبارك وتعالى قضى على نفسه
أنه من اعطش نفسه له في صائف سقاه يوم العطش
“মহান রাব্বুল আলামিন নিজের উপর অবধারিত করে নিয়েছেন, যে ব্যক্তি কেবলমাত্র তাঁর
সন্তুষ্টির জন্য গ্রীষ্মকালে (ছিয়ামের কারণে) পিপাসার্ত থেকেছে, তিনি তাকে
তৃষ্ণার দিন (তথা কিয়ামতের কঠিন দিনে) পানি পান করাবেন।” (মাজমাউয যাওয়াইদ
হা/৫০৯৫, মুসনাদে বাযযার হা/১০৩৯)
অপর আরেকটি হাদীছে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
(ছাঃ) বলেছেন- قال الله تعالى : الصيام لي وأنا أجزي به ... فإن لهم يوم القيامة
حوضا ما يرده غير الصائم
“মহান আল্লাহ তা'আলা বলেন, ছিয়াম আমার জন্য, আর আমি নিজেই স্বয়ং এর প্রতিদান
দিব। কিয়ামতের দিন ছিয়াম পালনকারী ব্যক্তিদের জন্য একটি বিশেষ পানির হাউজ
থাকবে, যেখানে ছিয়াম পালনকারী ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারো আগমন ঘটবে না।” (মাজমাউয
যাওয়াইদ হা/৫০৯৩, মুসনাদে বাযযার হা/৮১১৫)
লেখকের ইতি কথাঃ পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হদীছের আলোকে রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য ১৩টি
সম্মানিত পাঠক, আশা করি উপরোক্ত আলোচনা গুলো থেকে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হদীছের
আলোকে রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য ১৩টি এ বিষয় সম্পর্কে পুরোপুরি বিস্তারিত ভাবে
জানতে পেরেছেন। বর্তমান সময়ে মানুষ পৃথিবীর বুকে ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও
আত্মমর্যাদার অধিকারী হয়ে এই জীবনকে সুন্দরভাবে সম্মানের সাথে কাটাতে চাই।
কিন্তু উক্ত বিষয়গুলো পাওয়ার জন্য মানুষ বিভিন্ন ধরনের জানা-অজানা গুনাহ করে
থাকে। কারণে যেকোনো মূল্যেই তাকে ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর সুখ স্বাচ্ছন্দ হাসিল করতেই
হবে।
তাই এই ধরনের মারাত্মক গুনাহ গুলো কে ক্ষমা করিয়ে নেওয়ার জন্য বিশেষ আমলের
প্রয়োজন। আর সেই মহৎ ইবাদতটিই হচ্ছে পবিত্র রমযান মাসের ছিয়াম পালন করা। কারণ
ঈমানের সহিত ও ছাওয়াবের আশায় পবিত্র রমাযানের ছিয়াম পালন করলে মহান আল্লাহ
তা’য়ালা বান্দার জীবনের যাবতীয় গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন। পরকালীন জীবনের মুক্তির
জন্য ও চিরস্থায়ী জীবনের সুখের জন্য পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হদীছের আলোকে রোজার
গুরুত্ব ও তাৎপর্য ১৩টি এ বিষয় সম্পর্কে পড়ে ভালোভাবে জেনে নিতে হবে এবং
শুধুমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই সকল কাজ করতে হবে
তবেই আপনি পরকালীন জীবনে সফলতা অর্জন করতে পারবেন।
তাই আপনি যদি ক্ষণস্থায়ী বিসর্জন দিয়ে চিরস্থায়ী সুখের জন্য যাবতীয় নেক আমল
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করেন, তবে আপনি উভয়ে জগতেই শান্তিতে থাকতে পারবেন। তবে
যদি আপনার জীবনকে উভয় জগতে ভালোভাবে উপভোগ করতে চান সে ক্ষেত্রে অবশ্যই আপনাকে
পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হদীছের আলোকে রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য ১৩টি এই আর্টিকেলটি
সম্পূর্ণ মনোযোগ সহকারে পড়তে হবে। তাহলে আপনি খুব দ্রুতই একটি সুখী ও সুন্দর
সাজানো গোছানো সম্মানের জীবন যাপন করতে পারবেন।
সম্মানিত পাঠক, এতক্ষণ আমাদের সাথে থেকে এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ মনোযোগের সাথে
পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমরা আমাদের ওয়েবসাইটে এ ধরনের তথ্যবহুল
কার্যকরী ও উপকারী আর্টিকেল নিয়মিত পোস্ট করে থাকি। তাই আপনি যদি এ ধরনের আরও
তথ্যবহুল ও উপকারী সব আর্টিকেল পড়তে চান, তাহলে অবশ্যই আমাদের এই ওয়েবসাইটটি
নিয়মিত ফলো করুন। সাথে সাথে এই আর্টিকেলটি পড়ে ভালো লাগলে আপনার নিকট আত্মীয়,
বন্ধু-বান্ধব ও পরিবার-পরিজনদের কাছে তাদের উপকারার্থে শেয়ার করে দিন।
যেন তারা পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হদীছের আলোকে রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য ১৩টি এ বিষয়
সম্পর্কে পুরোপুরি ভালোভাবে জেনে নিতে পারে। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হদীছের আলোকে
রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য ১৩টি এ বিষয় সম্পর্কে আপনার যদি কোন গুরুত্বপূর্ণ মতামত
বা প্রশ্ন থাকে, তাহলে অবশ্যই নিচে দেওয়া মতামত বাক্সে কমেন্ট করতে ভুলবেন না।
আবার আপনাদের সাথে কথা হবে নতুন কোন আর্টিকেল নিয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত নিরাপদ ও
সুস্থ থাকুন।
কনফিডেন্স আইটি নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url